জাভেদের বাঙলার পাঠশালা

প্রকাশিত: ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৭:০৪:১২ | আপডেট: ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৭:০৪:১২ 4
জাভেদের বাঙলার পাঠশালা

ঢাকার নীলক্ষেতে গাউসুল আজম সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলা। চৌকোনা একটি ঘর। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিবেচনায় ক্ষুদ্র বলাই যথার্থ। খোলা দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দৃষ্টি কেড়ে নেয় অনাড়ম্বর কক্ষের অভিজাত দেয়াল। দেয়ালজুড়ে সাঁটা কার্ল মার্ক্স, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রমুখের ওপর পাঠচক্রের পোস্টার কিংবা তাঁদের আবক্ষ স্থিরচিত্র। এসবকিছুই ক্ষুদ্র কক্ষটিকে শাশ্বত জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করে রেখেছে যেন। দেয়ালঘেঁষা বইয়ের তাকে, চেয়ারে-টেবিলে, মেঝেতে; সুবিন্যস্ত, অবিন্যস্ত কিংবা স্তূপীকৃত; সীমিত পরিধির যথাসম্ভব সবটুকু জুড়ে অজস্র বইয়ের উপস্থিতি ঘরটিকে করে তুলেছে বহুমুখী জ্ঞানের আধার।

দৃষ্টির মুগ্ধতা হৃদয়ে চেপে হাতলবিহীন চেয়ার টেনে বসি। মুখোমুখি চেয়ারে আহমেদ জাভেদ চৌধুরী। ‘বাঙলার পাঠশালা’ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। পেশাগত জীবনে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তিনি।

শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতেই বস্তির এক ছোট ঘরে শুরু হয়েছিল বাঙলার পাঠশালার কার্যক্রম। ছবি: সংগৃহীতশিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতেই বস্তির এক ছোট ঘরে শুরু হয়েছিল বাঙলার পাঠশালার কার্যক্রম। ছবি: সংগৃহীতআলাপের শুরুতে জানালেন, ‘বাঙলার পাঠশালা একটি সামাজিক সেবামূলক সংগঠন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একীভূত করার মধ্য দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখে সংগঠনটি। যার মূলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা।’ এ লক্ষ্যেই বিভিন্ন তাত্ত্বিক-গবেষকের ওপর পাঠচক্র আয়োজন করেন তাঁরা। পাশাপাশি সংগঠনটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান, সংবিধান পাঠ, রচনা প্রতিযোগিতাসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে। সবিস্তারের সেসবই জানালেন আহমেদ জাভেদ চৌধুরী।

বস্তি থেকে যাত্রা শুরু ২০০৭ কি ২০০৮ সালের কথা। জাভেদ চৌধুরীর বাসায় কাজ করতেন বানু নামে একজন নারী। ছোট্ট ছেলে হারুনকে ঘরে রেখে কাজে আসতেন তিনি। হঠাৎ একদিন খবর এল, বস্তির পাশের ফুটপাতে খেলতে গিয়ে ছেলেটি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। বানুকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে গেলেন জাভেদ চৌধুরী। গিয়ে দেখলেন, ছেলেটি মারা গেছে। প্রচণ্ড আহত হলেন। বানুকে কখনো গৃহকর্মীর দৃষ্টিতে দেখেননি। নিজের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই ভাবতেন। ফলে তাঁর সন্তানের মৃত্যু জাভেদ চৌধুরীকেও ছুঁয়ে গেল ভীষণভাবে। কী করা যেতে পারে—ভাবছিলেন বিরামহীন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে নিয়েই আয়োজন করা হয়েছিল পাঠচক্র। ধারাবাহিক সেই পাঠচক্রের একটি ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত এই অর্থনীতিবিদঅধ্যাপক রেহমান সোবহানকে নিয়েই আয়োজন করা হয়েছিল পাঠচক্র। ধারাবাহিক সেই পাঠচক্রের একটি ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত এই অর্থনীতিবিদসেই থেকে ছুটির দিনগুলোতে বস্তিতে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে মিশতে লাগলেন। তারা যেন একাকী রাস্তায় বের না হয়, এ ব্যাপারে তাদের বোঝাতে লাগলেন। কিন্তু খেয়াল করলেন, এই পন্থা খুব একটা কার্যকর নয়। অধিকাংশ শিশুই স্কুলে যায় না। তাদের অক্ষরজ্ঞানটা আগে জরুরি। সেই ভাবনা থেকে তাদের পড়াতে শুরু করলেন। একসময় বস্তির মানুষদের ভেতর সচেতনতা তৈরি হতে লাগল। তারা পড়ানোর জন্য একটি কক্ষও ছেড়ে দিল। জাভেদ চৌধুরী আশাবাদী, স্বাপ্নিক মানুষ। পুরোনো একটি স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল আবার; নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে জন্ম যে স্বপ্নের। স্বপ্নটা—শ্রেণিহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বাস্তবায়নের। আর এ জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরে শিক্ষা। ব্যাপারটি নিয়ে দু-একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বললেন। তাঁরাও পাশে এসে দাঁড়ালেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এনায়েত হোসেন কিংবা এমদাদুল হকের মতো বন্ধুদের এই আন্তরিক সম্পৃক্ততা সাহসী করে তোলে তাঁকে। শিক্ষা আন্দোলনটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম দিলেন ‘বাঙলার পাঠশালা’।

অঙ্কুরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

যাত্রা শুরু হলো বাঙলার পাঠশালার। যার অঙ্কুরে রোপিত রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙলার পাঠশালার আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘সংস্কৃতির ভাঙ্গা সেতু’ রীতিমতো ‘নির্দেশক পুস্তিকা’র মতো প্রভাব ফেলে। নিম্নবিত্তের সঙ্গে মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধের যে অনুপ্রেরণা ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি, তা–ই হলো অনুপ্রেরণা। এ ছাড়া বিশ্ব অর্থনৈতিতে নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নে নয়, জ্ঞানগত উন্নয়নেও জোর দেওয়া জরুরি। আর এ ক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মধ্যবিত্তের সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।

পাঠচক্রে উপস্থিতির হার এমনই হয়পাঠচক্রে উপস্থিতির হার এমনই হয়জাভেদ চৌধুরী বলছিলেন, ‘বস্তিবাসী মানুষগুলোর মনের সৌন্দর্য আমার মননে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। এসব প্রান্তিক মানুষের ঘরগুলো অপরিচ্ছন্ন, অসুন্দর কিন্তু হৃদয়টা সুন্দর। অন্যদিকে মধ্যবিত্তের ঘরগুলো সুসজ্জিত-সুন্দর কিন্তু অনেকের হৃদয়টা ঠিক অতটা সুন্দর নয়; যতটা সুন্দর হলে সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। ফলে তাদের মানসিক সৌন্দর্যের উন্নয়নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

এসব উপলব্ধি থেকে বাঙলার পাঠশালার কার্যক্রম বিস্তৃতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ২০০৯ সালে ‘বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন’ যখন সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয় সেবামূলক সংগঠন হিসেবে, তখন স্কুল কার্যক্রমের নাম বদলে দিয়ে করা হয় ‘শক্তি বিদ্যালয়’। কেন? তিনি বলেন, ‘সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এই মানুষগুলোর জন্য শিক্ষাটা কেবলই অপেক্ষাকৃত সচ্ছল জীবনের উপাদান নয়, বরং মূলধারায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার প্রধানতম শক্তি। এই ভাবনা থেকেই নামকরণ করা হয় “শক্তি বিদ্যালয়”।’

বাঙলার পাঠশালার আলোচনা অনুষ্ঠানে অতিথি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানবাঙলার পাঠশালার আলোচনা অনুষ্ঠানে অতিথি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানশক্তি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য দুধ-ডিমের ব্যবস্থা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি—এমন সব মানবিক কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাসস্টেশনে, বস্তিতে এমন ছয়টি শিক্ষালয় রয়েছে শক্তি বিদ্যালয়ের। শহীদ খালেক ও মেজর সালেক বীর উত্তম ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন, ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন ও ব্যবসায়ী শাহ রেজাউল হাকিমের অর্থায়নে চলছে স্কুলগুলো।

মননে বাংলাদেশ তরুণ প্রজন্মের ভেতর মুক্ত জ্ঞান সৃষ্টি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কারিকুলাম বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে প্রাসঙ্গিক নয়। ইউরোপকেন্দ্রিক সিলেবাস উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক পাঠ্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যতটা গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করা হয় ভিনদেশিতত্ত্ব, যতটা যত্নে ভিনদেশি তাত্ত্বিকরা পঠিত হয়ে থাকেন, ততটা গুরুত্বের সঙ্গে কি দেশীয় গবেষক-তাত্ত্বিকদেরকে সিলেবাসভুক্ত করা হয়েছে? বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, ভূখণ্ডগত স্বকীয়তা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য প্রভৃতি সার্বিক বিবেচনায় একজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রমুখ অধিকতর প্রাসঙ্গিক নিশ্চয়ই। জ্ঞানের বিশ্বায়নে ভিনদেশি তাত্ত্বিকরা অবশ্যই পঠিত হবেন, কিন্তু দেশীয় জ্ঞান গুরুরাও সিলেবাসে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।

শক্তি বিদ্যালয়ের শক্তি তো এরাইশক্তি বিদ্যালয়ের শক্তি তো এরাই
পাঠচক্রে ভাষার দায়মোচনের অঙ্গীকার

সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ যেমন বাংলা ভাষায় নিরক্ষর, তেমনই সুবিধাপ্রাপ্ত মহলেও প্রাণের ভাষাটি বাস্তবিক অর্থে সমাদৃত নয়। উচ্চশিক্ষা স্তরে বাংলা ভাষায় পাঠদানের প্রক্রিয়া এখনো সন্তোষজনক নয়। অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! সেই ভাবনা থেকেই বাঙলার পাঠশালা দেশীয় তাত্ত্বিকদের ওপর নিয়মিত পাঠচক্র আয়োজনের পরিকল্পনা করে। যাত্রাটা শুরু হয় ২০০৯ সালের মে মাসে। সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে বছরে একজন করে তাত্ত্বিকের ওপর পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বছরজুড়ে ১০টি ক্লাসে বিভক্ত এই পাঠচক্রে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণীরা। প্রতিটি ক্লাসই হয়ে থাকে বাংলা ভাষায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে জ্ঞানপিপাসু মানুষ নিবন্ধন করে ক্লাসগুলোতে অংশগ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রমুখের ওপর পাঠচক্র সম্পন্ন হয়েছে।

আসছেন অমর্ত্য সেন

আগামী মার্চে শুরু হচ্ছে বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ওপর পাঠচক্র। আহমেদ জাভেদ চৌধুরী সেই তথ্যই জানালেন, ‘আগামী ৯ মার্চ অনুষ্ঠেয় পাঠচক্রের উদ্বোধনী ক্লাসে উপস্থিত থাকার সম্মতি জানিয়েছেন খ্যাতিমান এই অর্থনীতিবিদ। মোট ১৬টি ক্লাস থাকবে তাতে। এর মধ্যে ১২টি ক্লাস উপস্থাপিত হবে বাংলায়। ৪টি ক্লাস হবে ইংরেজিতে, যেগুলোতে অংশ নেবেন বিদেশি আলোচকেরা।’

কোন ফাঁকে টেবিলের পাশে এসে জায়গা করে নিয়েছে ধূমায়িত চা, দুজনের কেউ খেয়ালই করিনি। নিঃসঙ্গ চায়ের কাপটাকে ঠোঁটে ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে আত্মবিশ্বাসী আহমেদ জাভেদ বলেন, ‘স্বপ্নের সাহসে ভর করে যখন পথে নেমেছিলাম, অনেকটা সংকোচ আর অনিশ্চয়তাও ছিল। যতই পথ চলছি, দেখছি, সংকোচ কাটছে, বাড়ছে সাহসের দৈর্ঘ্য। বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের ১০ জন বোর্ড সদস্য রয়েছেন। তাঁদের আন্তরিক সহায়তা সব কঠিন পথকে ক্রমশই সহজ করে তুলেছে।’

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )