ভোট বড় বালাই, অপ্রিয় হলেন না ট্রাম্প

প্রকাশিত: ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৬:১৪:৫২ | আপডেট: ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৬:১৪:৫২ 2
ভোট বড় বালাই, অপ্রিয় হলেন না ট্রাম্প


হোয়াইট হাউসের কর্তা বলেছিলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার বিষয় নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলবেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বাইরেও তিনি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করতে পারেন।

মার্কিন মনোভাবের আগাম এ আভাস দেওয়া হয়েছিল ট্রাম্পের ভারত সফর শুরুর ঠিক দুই দিন আগে। সংশোধিত নাগরিক আইন (সিএএ) ও প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) নিয়ে গোটা ভারতে বেশ কিছুদিন ধরেই তুলকালাম চলছে। দেশের মুসলমান মন খুবই চঞ্চল, ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত। রাজ্যে রাজ্যে বিক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়েছে। একাধিক রাজ্য এ আইন ও এনআরসির বিরোধিতা করে রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে এ পরিস্থিতিতে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন এবং সফরে তিনি বিষয়টি তুলবেন, তা জানানোই ছিল ওই কর্তার কাজ। ফলে এ সফর ঘিরে অন্য সব আগ্রহের পাশাপাশি এ কৌতূহলও দানা বাঁধছিল, সিএএ বা এনআরসি নিয়ে মোদিকে ট্রাম্প কী বলেন, কোন পরামর্শ দেন।

কৌতূহল ও আগ্রহ বেড়েছিল আরও এ কারণে, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্টই স্পর্শকাতর। এ স্পর্শকাতরতার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র একটা সময় নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সিএএ ও এনআরসি নিয়ে ওই দেশেও নানা প্রশ্ন ও আপত্তি শোনা যাচ্ছে। কাজেই ন্যায়ের জন্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সদা সতর্ক যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কী বার্তা দিতে পারে, তা দেখার সংগত আগ্রহ সব মহলে ছিলই। সেই আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায় সফরের প্রথম দিনেই দিল্লিতে দাঙ্গা বাধায়। দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় ট্রাম্প যখন সংবাদ সম্মেলন করছেন, দাঙ্গার বলি ততক্ষণে বেড়ে ‘ডাবল ডিজিটে’ পৌঁছে গেছে। ঠিক সেই সময় সংবাদ সম্মেলনে এসে ট্রাম্প প্রথমেই বলেন, ‘বিতর্কিত কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলব না ঠিক করেছি। আমি চাই না দুই দিন থাকা ও দুই দিন আসা-যাওয়া চার দিনের এই সফরের সবকিছু একটিমাত্র প্রশ্নে থমকে যাক।’

কোন প্রশ্নের কথা ট্রাম্প বলেছেন, তা অনুমানসাপেক্ষ। তবু অবধারিতভাবে মোক্ষম সেই প্রশ্ন ওঠে। একবার নয়, দুবার নয়, তিন-তিনবার। বিভিন্নভাবে। ট্রাম্প এড়িয়ে যাননি। তবে তাঁর উত্তরে হোয়াইট হাউসের কর্তার উদ্বেগ ধরা পড়েনি। তিনি বলেন, ‘সিএএ নিয়ে কোনো আলোচনা মোদির সঙ্গে করিনি। ওটা ভারতের ওপরেই ছেড়ে দিয়েছি। আশা করি দেশের পক্ষে ঠিক সিদ্ধান্তই তারা নেবে।’ দিল্লির দাঙ্গা প্রসঙ্গও তোলেননি। বলেন, ‘ব্যক্তিগত আক্রমণের খবর আমি শুনেছি। কিন্তু তা নিয়ে মোদির সঙ্গে কথা বলিনি। ওটা ভারতের বিষয়।’ তবে স্বীকার করেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মোদির সঙ্গে কথা হয়েছে। শুধু মুসলমান নয়, খ্রিষ্টানদের নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। মোদি তাঁকে বলেছেন, তিনি ধার্মিক। ধর্মীয় স্বাধীনতারও পক্ষে। তাঁর দেশে ২০ কোটি মুসলমান বাস করেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় ভালো কাজ করছেন। ট্রাম্প জানান, মোদির উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট।

আগ্রহের ফানুসের চুপসে যাওয়া ওখানেই। সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ামাত্র ছড়িয়ে পড়ে একরাশ বিস্ময়! দেশের সাবেক কূটনীতিক কৃষণ চন্দ্র সিং দেরি না করে টুইট করেন, ‘দিল্লির দাঙ্গা বেড়েই চলেছে। অথচ দুটিমাত্র শব্দে ট্রাম্প তা ঝেড়ে ফেললেন! আপটু ইন্ডিয়া! সবাই মোদির জয় দেখছে। কিন্তু হায়, ক্ষতিগ্রস্ত হলো ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের ভিত।’

আতিথেয়তা গ্রহণের পর গৃহস্থের নিন্দা-সমালোচনা শিষ্টাচারের পর্যায়ে পড়ে না। সম্ভবত সেই কারণেই সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে নিজের অবস্থান ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন। তিনি জানেন, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারতের যেমন আমেরিকাকে প্রয়োজন, আমেরিকারও তেমন ভারতের হাত ধরা ছাড়া উপায় নেই। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে রুখতে ভারতকে প্রয়োজন। ইসলামি সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলাতেও দরকার। ৩০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশাপাশি ট্রাম্প তাই প্রযুক্তি হস্তান্তরে আগ্রহ দেখিয়েছেন। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আমেরিকার অনুকূলে নয়। কৃষিজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার উন্মুক্ত না হলে, শুল্ক হার কমানো না গেলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। দুটি ক্ষেত্রেই ভারতের অনাগ্রহ এখনো তীব্র। বিশ্বখ্যাত মোটরবাইক হার্লে ডেভিডসন ভারতের বাড়াবাড়ি রকমের শুল্কনীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের শুল্কনীতিকে এ কারণে ট্রাম্প একাধিকবার ‘নটোরিয়াস’ বলে বর্ণনাও করেছেন। এ সফর তাই ট্রাম্পের কাছে ছিল এতটাই জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য চুক্তি এ সফরে যে সই হবে না, তা আগেভাগেই জানানো হয়েছে। কবে তা সই হয়, আপাতত শুরু তার প্রতীক্ষা। সেটা হলে বোঝা যাবে কে কতটা ঝুঁকলেন। কার ঘর কতটা ভরল।

নীতি বদলানোর এ তাগিদ নির্বাচনের বছরে ব্যবসায়ী ট্রাম্পের কাছে যতটা তীব্র, ততটাই ব্যাকুল তিনি অভিবাসী ভারতীয়দের সমর্থন আদায়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ কোটি মানুষের মধ্যে ৪০ লাখ ভারতীয়-আমেরিকান। চার বছর আগের নির্বাচনে তাঁদের ৭৭ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন হিলারি ক্লিন্টনকে। ট্রাম্প পেয়েছিলেন মাত্র ১৬ শতাংশের সমর্থন। ইদানীং সর্বশেষ জরিপ বলছে, ইমপিচমেন্টের বাধা টপকে, বাণিজ্য বাড়িয়ে, বেকারত্বের হার কমিয়ে, অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো ট্রাম্পকে ৩৬ শতাংশ ভারতীয়-আমেরিকান সমর্থনে প্রস্তুত। এই মানুষজনের হিরো একজনই। নরেন্দ্র মোদি। গত বছর হিউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ তারই জ্বলজ্বলে প্রমাণ। তাঁদের অধিকাংশই ধনী গুজরাটি। নির্বাচনী তহবিলে উপুড়হস্ত হতে তাঁদের তর সয় না। ৩০ ঘণ্টা গগনবিহার করে মাত্র ৩৫ ঘণ্টার জন্য ভারতে আসার তাগিদ ট্রাম্প তাই এমনি এমনি অনুভব করেননি। ভারতের সঙ্গে আর কোনো দেশকে তিনি এ সফরে জোড়েনওনি। দিল্লি না নেমে সরাসরি তিনি গেলেন মোদি রাজ্য গুজরাটের আহমেদাবাদে। সোয়া লাখ লোকের সামনে মোদির জয়গান করলেন প্রভূত। তাঁকে অভিহিত করলেন ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলে। মাত্র কয়েক মাস পর যাঁদের সমর্থন তাঁর দরকার, সেই বিপুল জনরাশির অবিসংবাদিত নেতার দেশে আমন্ত্রিত হয়ে এসে তাঁরই নীতির সমালোচনা করার মতো বোকা আর যে-ই হোন, ডোনাল্ড ট্রাম্প নন। ধুরন্ধর ব্যবসায়ী তিনি। লাভ-লোকসান কোথায় কতখানি, তা তাঁর বিলক্ষণ জানা।

কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্র অটুট রাখার বিষয়টি একেবারে ঊহ্য ছিল না। আহমেদাবাদের উপকণ্ঠে মোটেরা স্টেডিয়ামে লক্ষাধিক মানুষের সামনে ভারতের বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদী চরিত্রের কথা ট্রাম্প বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমেরিকার মতো ভারতেরও শক্তির আধার হলো ভয়মুক্ত সমাজ, মানুষের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখা এবং বহুত্ববাদী বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।’ স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ‘প্রতিটি মানুষের মধ্যে আমি ঈশ্বরের দর্শন পাই’ শোনানোর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘এ দেশে সবাই একসঙ্গে হোলি-দিওয়ালি পালন করেন। ১০০ ভাষায় কথা বলেন।’ মঙ্গলবার রাত ১০টায় দেশে রওনা হওয়ার পর ভারত যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, তাতে লেখা হয়েছে, ‘সার্বভৌম ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দেশই স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। সব নাগরিককে সমান অধিকার দেয়। মানবাধিকার রক্ষা করে ও আইনের শাসনকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।’

প্রকাশ্যে যা বলতে পারেননি, নিভৃত আলোচনায় ট্রাম্প সে কথা মোদিকে বলেছেন কি না, জানা যাবে না। প্রশ্ন এটাই, মার্কিন কংগ্রেসের একাংশের তীব্র চাপ সত্ত্বেও সিএএ-এনআরসি নিয়ে মুখ না খোলা, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে দৃশ্যত নীরব থাকা কিংবা কাশ্মীরের মানবাধিকার হরণ নিয়ে রা না কাড়ার অন্তরালে কি ‘বন্ধু’ মোদির প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ কোথাও একটু কাজ করেছে? বিশেষ করে ভোট যখন এসে পড়েছে? হয়তো তাই। না হলে সশরীর উপস্থিত থেকেও দিল্লির দাঙ্গা না দেখার ভান করার অন্য কোনো কারণ নেই।

গান্ধীজির সবরমতি আশ্রমে দেখা গেল, ট্রাম্প ও মেলানিয়াকে নরেন্দ্র মোদি তিন বাঁদরের কাহিনিটা ভালো করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তিন বাঁদরের একজনের মুখে হাত। সে খারাপ কিছু বলবে না। দ্বিতীয়জনের চোখে হাত। খারাপ কিছু দেখবে না। তৃতীয়জনের কানে হাত। খারাপ কিছু শুনবে না। হয়তো গান্ধীজির এ শিক্ষাতেই শিক্ষিত হয়ে ট্রাম্প দেশে ফিরলেন।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )