নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা চাই

প্রকাশিত: ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১২:১৩:৩২ | আপডেট: ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১২:১৩:৩২ 4
নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা চাই

সম্প্রতি খাদ্য নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার নিয়ে পালিত হয়েছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এবারে নিরাপদ খাদ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘সবাই মিলে হাত মেলাই, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত চাই’। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এ মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভেজাল বা নিরাপদমুক্ত খাদ্য বাংলাদেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। এ কারণেই নিরাপদ খাদ্য ভোক্তার অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশের এ অধিকার বিভিন্নভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি। ভেজালের এ সর্বগ্রাসী রূপ নিরাপদ খাদ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভাবতে অবাক লাগে, শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। যে শিশু আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে সে শিশুর স্বাস্থ্য ও জীবন আজ হুমকির মুখে। এমনিই আমাদের বাজারে ফলমূলসহ খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল। বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদান রয়েছে যা শুধু শিশু নয়, বয়স্ক মানুষসহ সব মানুষের জন্য ক্ষতিকর। সরকার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে ২০১৩ সালে খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আইনগুলোকে, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ নামের একটি আইনের অধীনে আনে। এর আওতায় গঠন করা হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশে ভেজালমুক্ত খাদ্য যেন সোনার হরিণ। এক ধরনের মরীচিকা। যাকে ছোঁয়া যায় না, ধরাও যায় না। বাজারে এমন কোনো খাদ্য নেই যাতে ভেজাল নেই। আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদন বেশি হলেও ভেজালের কারণে ভোক্তাদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। খাদ্যের মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ওঠে। নিরাপদ খাদ্য আইন থাকলেও এক শ্রেণির অতি লোভী মানুষ আছেন যারা আইনের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেয়। ১৬ কোটি মানুষের দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে জড়িত রয়েছে মাত্র ১৮টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ আরো ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে জড়িত। মাঝে মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ভেজালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। তবুও খাদ্যে ভেজাল দেওয়া কমছে না। জনসাধারণের নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠিনভাবে আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

বর্তমান নৈতিক অবক্ষয়ের যুগে শুধু খাদ্যে ভেজাল নয় শিশুদের প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধেও ভেজাল। চারিদিকে চলছে ভেজালের কারবার। আমরা ভেজালের মধ্যে বাস করছি, ভেজালের মধ্যে ডুবে আছি। কোথায় ভেজাল নেই! খাদ্যে ভেজাল, চালে ভেজাল, বিভিন্ন মৌসুমি ফল- আম, জাম, লিচু, কলা, আনারস, প্রভৃতির পাশাপাশি শাকসবজিতেও ভেজাল। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। এ বছর স্থানীয় বাজারে ফলমূল কিনতে যাই। কয়েকজন ফল বিক্রেতা অপরিচিত বলে মনে হলো। একজন ফল বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলাম, খবর কী?

তিনি আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললেন, আপনি যেই হোন না কেন, সত্য কথা হলো ফরমালিন মেশোনো ছাড়া কোনো ফল পাবেন না। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কলাতে তো মেশানো নেই! মেশানো আছে তবে অল্প। আমি বেশি মেশাই না। অন্য সবাই আমার চেয়ে বেশি মেশায়।

বুঝতে পারলাম লোকটি হয়তো প্রকৃতপক্ষে সত্যি কথাই বলছে। ফরমালিন ছাড়া কোনো খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল পাওয়া দুষ্কর। এভাবে যদি বিভিন্ন জিনিসে ভেজাল হয়, ফরমালিন মেশানো হয় তাহলে প্রতিনিয়ত আমরা কী খাচ্ছি। খাদ্যে ভেজাল ব্যাপারটি সমাজের ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক বিষয়। এ নিয়ে আমরা খুব একটা চিন্তা-ভাবনা করি না, মাথা ঘামাই না। মাঝে মধ্যে অবশ্য ভেজালবিরোধী অভিযানের খবর সংবাদপত্রে দেখতে পাই। আসলে আমাদের নৈতিক চরিত্রের এতটা অধঃপতন হয়েছে, ভেজালের নেতিবাচক দিকের কথা মনে করি না। মানুষের চরম ক্ষতি করছে ভেজালকারীরা। অথচ মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব। ধ্যানে-জ্ঞানে, শিল্প-সাহিত্যে, বিজ্ঞান-দর্শনে মানুষের সমকক্ষ আর কোনো প্রাণীই নেই। কিন্তু মানুষ যত সভ্যতার সংস্পর্শে গিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে মানুষ তত বর্বর অসভ্য হয়েছে। যুগের পরিবর্তন হয়েছে, বিশ^সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমরা নিজেদের সভ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। অথবা বলতে পারি, সভ্যতার ভালো দিকগুলো গ্রহণ করিনি। কারণ সভ্যতা মানুষকে ভালো হতে শেখায়। উন্নত হতে শেখায়। মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। উল্টো স্রোতে আমরা চলছি। শুধু শহর বন্দর বা উপ-শহরই নয় আজকাল গ্রামগঞ্জেও ভেজালের কারবার। সভ্যতা যতই এগিয়ে গেছে ততই সর্বত্র ভেজালের সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীকে বলা হয় জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগ। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য, মনুষ্যত্ববোধ মানবিক জ্ঞানসম্পন্ন পরিপূর্ণ মানুষের অভাব রয়েছে। আমরা ব্যক্তিগত লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠতে পারিনি।

প্রতিনিয়ত সমাজের অধিকাংশ মানুষ বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে সমাজটা এমন এক পর্যায়ের গিয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছে, বাজারে যে কোনো ফল সেটা দেশি বা বিদেশি যাই হোক না কেন মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কার্বাইড। এটা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এমনকি এসব ফলফলারি পচন রোধে স্প্রে করা হচ্ছে ফরমালিন। যে কোনো পচনশীল খাদ্যদ্রব্যে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন। জীবন ধারণের জন্য খাদ্য আবশ্যক। ৫টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য অন্যতম। খাদ্যই যদি বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয় তাহলে যে সব খাদ্যদ্রব্য প্রয়োজন, যার মধ্যে কোনো ভেজাল নেই- একমাত্র ভেজালমুক্ত পুষ্টিকর খাবার মানুষকে সবল রাখে।

শুধু যে নামীদামি বেশি দামের খাবারই মানুষকে সুস্থ রাখে তা নয়। অল্প দামের বিভিন্ন শাকসবজি সুস্থ-সবল রাখে। কিন্তু এ সব দ্রব্যে যখন পচন রোধে ফরমালিন মেশানো হয় তখন তার পুষ্টিগুণই বিনষ্ট হয় না, খাওয়ার অনুপযোগী অখাদ্যে পরিণত হয়।

বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, ভেজালমুক্ত বা বিশুদ্ধ খাদ্য যেন সোনার হরিণ। শিশুদের তরল দুধে ভেজাল মানেই সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি। ভেজালের মধ্যে বাস। বিশুদ্ধ খাদ্য পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ভেজাল ও নিম্নমান খাদ্য খেয়ে মানুষ বিষাক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বিশেষ করে ইউরিয়া সার, হাইব্রোজ, ফরমালিন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আর ফরমালিন এখন মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। সরকার ফরমালিন প্রতিরোধে নানা ধরনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ বিল জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। ফরমালিন আমদানি কমলেও এর ব্যবহার কমেনি। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অন্য কেমিকেলের নামে অবৈধভাবে দেশের বিভিন্ন শুল্ক বন্দর নিয়ে এ বিষাক্ত ফরমালিন দেশে চলে আসছে। উপরন্ত শুল্ক বন্দরগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উন্নত ল্যাব না থাকাতে সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে জীবনধারনের জন্য ভেজালমুক্ত খাদ্য অপরিহার্য হওয়া সত্ত্বেও তার প্রাপ্যতা আজকাল প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ভাবতে অবাক লাগে, আজকের শিশু আগামী দিনে জাতির কর্ণধার হবে। মেধা মননে বড় হয়ে তারা জাতির সম্পদে পরিণত হবে সে শিশুর খাদ্যেও ভেজাল। তাহলে তারা সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে কীভাবে! বিষয়টি কতটা উদ্বেগের তা সহজেই অনুমেয়। সুস্থভাবে বেড়ে উঠা, বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা বিকাশের আগেই শিশুটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। কেননা, ভেজাল খাদ্য মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক, ভেজালযুক্ত খাবারের প্রভাবে মানুষ হৃদরোগ, কিডনি, লিভার, ক্যান্সারসহ নানা রকম মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগ দৃশ্যমান হয় না। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে লক্ষণগুলো মানবদেহে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় যা মানুষ সহজে বুঝতে পারে না। তাই মানুষ ভেজাল খাদ্যের কুফল সম্পর্কে এতটা সচেতন ও সতর্ক থাকে না। ভেজালযুক্ত খাবারের প্রবাহে মানুষের স্বাস্থ্য, আয়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শারীরিক দিক থেকে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে। শারীরিক অক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আমাদের ভাবতে লজ্জা করে, লোভ-লালসা মানুষকে কতটা নিচে নামিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্ন কেমিকেল, রঙ মেশানো হয় শুধু অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায়।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দূষিত খাবারের কারণে সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখের বেশি মানুষের। বাংলাদেশসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতি বছর দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। পরিসংখ্যানটি যেমন উদ্বেগজনক তেমনি পিলে চমকে দেওয়ার মতো। কিন্তু প্রতিকার হচ্ছে না। কারণ চারিদিকে ভেজাল আমাদের এমনভাবে ধরেছে, এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। তা না হলে একজন মানুষ কীভাবে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেয়? মানুষই ভেজালের মূল হোতা। আমাদের চরিত্রে ভেজাল, ভেজাল রোধ ও ভেজালকারীর শাস্তি জেল জরিমানাসহ বিভিন্ন বিধান রয়েছে। শিশুদের পাস্তুরিত বিভিন্ন কোম্পানির দুধে ভেজাল আমাদের অবশ্যই শঙ্কিত করে। খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও ভেজাল খাদ্য বিক্রি করার দায়ে জেল জরিমানা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বা সর্বোচ্চ শাস্তির নজির না থাকার কারণে ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না বলে অনেকেই মনে করেন।

সরকারকে অবশ্যই ভেজালের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল দেয় এক শ্রেণির মানুষ। যারা মানুষকে বিষাক্রান্ত করে আমাদের শিশুদের সর্বনাশ করছে। সে সমস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আবার আইন দিয়েই সব কিছু হয় না। তবুও আইনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে সবচেয়ে বড় কথা আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আমাদের চারিত্রিক গুণাবলি যদি উন্নত ও পরিশীলিত হতো তাহলে এক শ্রেণির মানুষ খাদ্যে ভেজাল দিত না। আমরা দিবস পালন করি কিন্তু দিবসের গুরুত্বানুযায়ী ব্যবস্থা নিই না। তবে আইনের পাশাপাশি আমাদের চরিত্রের পরিবর্তন দরকার।

লগইন করুন


পাঠকের মন্তব্য ( 0 )